ফেয়ার ট্রেডের মতো একটি বৈশ্বিক মান প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে অন্তত আটটি সংস্থা প্রতিযোগিতায় নেমেছে — কিন্তু সংজ্ঞার বিভ্রান্তি ও প্রতিযোগী উদ্যোগের ভিড়ে ভোক্তারা আরও বিভ্রান্ত হওয়ার শঙ্কায়।
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে একটি অদৃশ্য যুদ্ধ চলছে — কে আগে একটি বিশ্বস্ত, সর্বজনীনভাবে স্বীকৃত "মানুষের তৈরি" লেবেল তৈরি করতে পারবে। চলচ্চিত্রের পর্দা থেকে শুরু করে বইয়ের প্রচ্ছদ, ওয়েবসাইট থেকে বিজ্ঞাপনের বিলবোর্ড — সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে "Proudly Human", "Human-made", "No A.I" এবং "AI-free"-এর মতো ঘোষণা। এই আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়েছে একটি সহজ কিন্তু গভীর প্রশ্ন: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তারের যুগে কীভাবে মানুষ তার সৃজনশীলতার আলাদা পরিচয় দেবে?
বিবিসি নিউজের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, কমপক্ষে আটটি পৃথক উদ্যোগ বর্তমানে এমন একটি লেবেল তৈরির চেষ্টা করছে, যেটি নৈতিকভাবে উৎপাদিত পণ্যের বিশ্বখ্যাত "ফেয়ার ট্রেড" লোগোর মতো সারাবিশ্বে পরিচিতি পাবে। সংস্থাগুলোর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোম্পানি ও অলাভজনক প্রতিষ্ঠান।
কেন এই আন্দোলন?
এআই-মুক্ত সার্টিফিকেশনের দাবি উঠেছে মূলত তখন থেকে, যখন থেকে জেনারেটিভ এআই সরঞ্জামগুলো ফ্যাশন, বিজ্ঞাপন, প্রকাশনা, গ্রাহক সেবা এবং সংগীতসহ বিভিন্ন শিল্পে মানুষের কাজ ও সৃজনশীলতাকে প্রতিস্থাপন করতে শুরু করেছে। বলিউড চলচ্চিত্র স্টুডিও ইন্টেলিফ্লিক্সের মতো কোম্পানি গর্বের সাথেই ঘোষণা করছে যে তারা সম্পূর্ণ এআই দিয়ে ছবি বানাচ্ছে — এবং তা ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতির চেয়ে অনেক দ্রুত ও সস্তায়। কিন্তু অনেক পণ্যই ভোক্তাদের জানাচ্ছে না যে সেগুলো তৈরিতে এআই ব্যবহার হয়েছে।
সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ হলো গত বছরের ভাইরাল ব্যান্ড ভেলভেট সানডাউন — যখন উন্মোচিত হলো পুরো ব্যান্ডটিই এআই দিয়ে তৈরি। এই ঘটনা শ্রোতাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও আস্থার সংকট তৈরি করেছে।
ম্যানচেস্টার মেট্রোপলিটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভোক্তা বিশেষজ্ঞ ড. আমনা খান বলেন, "এআই উল্লেখযোগ্য বিঘ্ন ঘটাচ্ছে এবং 'মানুষের তৈরি' বলতে কী বোঝায় তা নিয়ে প্রতিযোগী সংজ্ঞাগুলো ভোক্তাদের বিভ্রান্ত করছে। আস্থা ও আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলতে একটি সর্বজনীন সংজ্ঞা অপরিহার্য।"
কীভাবে কাজ করে সার্টিফিকেশন?
সব সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা এক নয়। no-ai-icon.com বা notbyai.fyi-এর মতো কিছু লেবেল যে কেউ বিনামূল্যে বা সামান্য ফি দিয়ে ডাউনলোড করতে পারেন — তেমন কোনো যাচাই ছাড়াই। অন্যদিকে aifreecert.com-এর মতো ব্যবস্থায় কঠোর পেশাদার নিরীক্ষা ও এআই-শনাক্তকারী সফটওয়্যার ব্যবহার করা হয়।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক বুকস বাই পিপল প্রকাশকদের কাছ থেকে অর্থ নেয় এবং তাদের কার্যপ্রণালী ও লেখকদের যাচাই সম্পর্কে প্রশ্নপত্র পূরণ করতে বলে। কোম্পানিটি পর্যায়ক্রমে বইয়ের নমুনা যাচাই করে এআই লেখার উপস্থিতি পরীক্ষা করে। এ পর্যন্ত পাঁচটি প্রকাশনা সংস্থার সাথে চুক্তি হয়েছে এবং নভেম্বরে প্রকাশিত উপন্যাস টেলিনোভায় প্রথমবার তাদের মোহর লাগানো হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার প্রাউডলি হিউম্যান আরও কঠোর পদ্ধতি অনুসরণ করে। তাদের নিরীক্ষকরা পাণ্ডুলিপি থেকে ই-বুক সংস্করণ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে যাচাই করেন। কোম্পানিটি শীঘ্রই বড় প্রকাশনা সংস্থাগুলোর সাথে অংশীদারিত্বের ঘোষণা দিতে যাচ্ছে এবং সংগীত, ফটোগ্রাফি, চলচ্চিত্র ও অ্যানিমেশন খাতেও প্রবেশের পরিকল্পনা করছে।
কোম্পানির প্রধান অ্যালান ফিঙ্কেল বলেন, "শিল্পের নিজস্ব প্রচেষ্টাগুলো ব্যর্থ হয়েছে। 'মানবিক উৎস'-এর একটি সার্টিফিকেশন প্রয়োজন — কিন্তু স্ব-সার্টিফিকেশন যথেষ্ট নয়। তাই আমাদের একটি পূর্ণ যাচাই প্রক্রিয়া রয়েছে যা নিশ্চিত করে যে উপাদানটি সত্যিকার অর্থেই মানব-উদ্ভূত।"
যুক্তরাষ্ট্রের অথর্স গিল্ডের প্রোগ্রামে একটি বই "Human Authored" বিবেচিত হয় যদি পুরো লেখা মানুষের হাতে লেখা হয় — তবে বানান ও ব্যাকরণ পরীক্ষায় এআই ব্যবহার করা চলে। এ পর্যন্ত ৩,০০০-এরও বেশি লেখক ৫,০০০ শিরোনাম নিবন্ধন করেছেন।
চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতিতেও ঢেউ
শুধু বই নয়, চলচ্চিত্র শিল্পেও এই আন্দোলনের ঢেউ লেগেছে। ২০২৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত হিউ গ্র্যান্ট অভিনীত থ্রিলার হেরেটিকের শেষ কৃতিত্বে প্রযোজকরা স্পষ্টভাবে লিখেছিলেন যে এই ছবি নির্মাণে কোনো জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করা হয়নি। চলচ্চিত্র পরিবেশক দ্য মিজ অঁ সেন কোম্পানি তাদের সর্বশেষ ছবির পোস্টারে "কোনো এআই ব্যবহার করা হয়নি" মোহর যুক্ত করেছে এবং অনলাইনে নিজস্ব শ্রেণিবিন্যাস প্রকাশ করেছে, আশা করছে শিল্পের অন্যরাও এটি অনুসরণ করবেন।
প্রকাশনা জায়ান্ট ফেবার অ্যান্ড ফেবার কিছু বইয়ে "Human Written" মোহর যুক্ত করতে শুরু করেছে। লেখক সারাহ হল তার উপন্যাস হেলমে এই মোহরটি যুক্ত করার অনুরোধ করেছিলেন এবং এআই মডেল প্রশিক্ষণে বই ব্যবহারকে "বৃহৎ পরিসরে সৃজনশীল লুণ্ঠন" বলে বর্ণনা করেছেন। তবে ফেবার স্পষ্ট করেনি যে তারা "মানুষের লেখা" বইকে কীভাবে শ্রেণিবদ্ধ করে বা এআই ব্যবহার হয়নি তা নিশ্চিত করতে কী ধরনের যাচাই করে।
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
তবে এআই বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন যে "এআই-মুক্ত" ধারণাটি প্রযুক্তিগতভাবে বাস্তবায়ন করা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে। এআই গবেষণা বিজ্ঞানী সাশা লুচিওনি বলেন, "এআই এখন এতটাই সর্বব্যাপী এবং বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম ও সেবায় এতটাই সংযুক্ত যে, 'এআই-মুক্ত' বলতে কী বোঝায় তা নির্ধারণ করা সত্যিই জটিল। কারিগরি দৃষ্টিকোণ থেকে এটি বাস্তবায়ন কঠিন। এআইকে একটি বর্ণালি হিসেবে দেখে দ্বিমুখী পদ্ধতির বদলে আরও ব্যাপক সার্টিফিকেশন ব্যবস্থার দরকার।"
বুকস বাই পিপলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা এসমে ডেনিস বলেন, "প্রকাশকরা এমন এক নতুন পরিবেশের সাথে লড়াই করছেন যেখানে মাস বা বছরের বদলে মিনিটেই বই তৈরি সম্ভব এবং পাঠকরা আর নিশ্চিত হতে পারছেন না যে কোনো বই মানবিক অভিজ্ঞতার প্রতিফলন নাকি যন্ত্রের অনুকরণ।"
ফেয়ার ট্রেড লোগোর উদাহরণটি আশাব্যঞ্জক হলেও বাস্তবতা হলো, সেই মান প্রতিষ্ঠায় দশকের পর দশক লেগেছিল — এবং সেটি ছিল বস্তুগত সাপ্লাই চেইনের জন্য, সৃজনশীল প্রক্রিয়ার জন্য নয়। একাধিক প্রতিযোগী লেবেলের কারণে ভোক্তাদের মধ্যে "লেবেল ক্লান্তি" তৈরি হওয়ার আগেই বাজারে একটি সর্বজনীন মান প্রতিষ্ঠা জরুরি বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ায় এই আন্দোলনের সরাসরি প্রভাব এখনও সীমিত হলেও প্রকাশনা, চলচ্চিত্র এবং সংগীত শিল্পের সাথে যুক্তরা বিষয়টি নিয়ে ভাবতে শুরু করেছেন। বৈশ্বিক এই প্রবণতা যদি একদিন আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে রূপ নেয়, তাহলে এ অঞ্চলের সৃজনশীল শিল্পকেও সেই মানদণ্ড মেনে চলতে হতে পারে।